নরসিংদীর জেলপালানো ‘ওস্তাদ’ বোমাসহ ধরা: নব্য জেএমবির পুনর্গঠন ও বাড়ছে জঙ্গি তৎপরতার ঝুঁকি
রাজধানীর ডেমরার সারুলিয়া এলাকায় পরিচালিত এক রোমাঞ্চকর যৌথ অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে অত্যন্ত বিপজ্জনক দুটি তাজা হাতবোমা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, এই বোমাসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে নরসিংদী জেলা কারাগার থেকে পলাতক আলোচিত জঙ্গি সদস্য জুয়েল ভুঁইয়া ওরফে ‘ওস্তাদ’কে। পুলিশ জানায়, জুয়েল নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন ‘নব্য জেএমবি’র শীর্ষ বিস্ফোরক কারিগর নাজমুল হাসান মামুন ওরফে ‘বোমারু মামুন’-এর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী। এই গ্রেপ্তারের মাধ্যমে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালানোর এক বড় নাশকতামূলক পরিকল্পনা নস্যাৎ করা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের কর্মকর্তারা।
১. কারাগারে সখ্যতা ও অভিনব জেলপালানোর পটভূমি
নরসিংদীর শিবপুরের কাজীরচরের বাসিন্দা জুয়েল ভুঁইয়াকে ২০২৩ সালে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ‘হিযবুত তাহরীর’-এর সাথে জড়িত থাকার সন্দেহে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ)।
পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে সৃষ্ট চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে নরসিংদী কারাগারে অভূতপূর্ব হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর চালানো হয়। সশস্ত্র দুষ্কৃতকারীরা কারাসেলের তালা ভেঙে দিলে ৯ জন তালিকাভুক্ত বিপজ্জনক জঙ্গিসহ মোট ৮২৬ জন কয়েদি পালিয়ে যায়। সেই সময় কারাগারের অস্ত্রাগার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কারারক্ষীদের কাছ থেকে ৮৫টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৮ হাজার ১৫০ রাউন্ড তাজা গুলি লুট করা হয়। জেল থেকে পালিয়ে যাওয়ার মাত্র ছয় দিন পর, ২৫ জুলাই জেলা পুলিশ জুয়েলকে পুনরায় গ্রেপ্তার করে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে পাঠায়।
তবে কাশিমপুর কারাগারেই জুয়েলের জঙ্গি জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। সেখানে নব্য জেএমবির মূল বোমার কারিগর ‘বোমারু মামুন’-এর সাথে তার গভীর সখ্যতা গড়ে ওঠে। এরপর ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেপ্টেম্বর মাসে আইনি ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে মামুন ও জুয়েল উভয়েই জামিনে মুক্ত হয়ে ফের গোপনে একত্রিত হয় এবং নাশকতামূলক নেটওয়ার্ক পুনর্সংগঠনের কাজ শুরু করে।
২. সম্প্রতি পরিচালিত ধারাবাহিক নাশকতার তথ্য ও প্রমাণ
পুলিশ ও গোয়েন্দা তথ্যে প্রকাশ পায় যে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটা সিরিজ বোমাতঙ্ক ও নাশকতায় এই চক্রটির প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে:
• কেরানীগঞ্জ বিস্ফোরণ (ডিসেম্বর ২০২৫): ঢাকার কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় গোপনে বোমা তৈরির সময় দুর্ঘটনাবশত বিস্ফোরণ ঘটে।
• যাত্রাবাড়ীতে হামলা (ফেব্রুয়ারি ২০২৬): রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে নিয়মিত তল্লাশিকালে পুলিশকে ছুরিকাঘাত করে বোমাভর্তি ব্যাগ ফেলে পালিয়ে যায় এই চক্রের সদস্যরা।
• ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা (মার্চ ২০২৬): কুমিল্লার একটি শিব মন্দিরে এবং রাজধানীর সায়েদাবাদে তল্লাশি চৌকিতে বোমা বিস্ফোরণের পেছনে বোমারু মামুন ও তার শিষ্যদের নাম উঠে আসে।
• জনাকীর্ণ স্থানে বোমাতঙ্ক (জুলাই ২০২৬): সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ‘উল্টো রথযাত্রার’ দিনে মতিঝিল মেট্রো রেল স্টেশনের নিচে ছাতার ভেতর ‘পাইপ বোমা’ এবং আশুলিয়ার চারাবাগের চায়ের দোকানে ‘প্রেশার কুকার’ বোমা ফেলে রাখার পেছনেও মামুনের হাত ছিল।
৩. ডেমরায় যৌথ অভিযান ও বোম নিষ্ক্রিয়করণ
সম্প্রতি যাত্রাবাড়ীর জনপদ মোড়ে পুলিশের ওপর হামলা ও নাশকতার একটি মামলার তদন্তে নেমে সিটিটিসি খবর পায় যে, বোমারু মামুনের সহযোগী জুয়েল ডেমরার সারুলিয়া এলাকার পশ্চিম নিঝুমবাগে আত্মগোপন করে আছে।
রোববার বিকেলে পুলিশ ও অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) যৌথভাবে নিঝুমবাগের ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়ে জুয়েল ভুঁইয়াকে গ্রেপ্তার করে। তার হেফাজত থেকে দুটি তাজা হাতবোমা উদ্ধার করা হয়। খবর পেয়ে রাত সাড়ে ৮টার দিকে সিটিটিসির বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে সতর্কতার সাথে কাজ শুরু করে এবং রাত ১১টার দিকে বোমা দুটি সফলভাবে নিষ্ক্রিয় করে।
৪. জঙ্গি নেটওয়ার্কের মেলবন্ধন ও নিরাপত্তাঝুঁকি
নব্য জেএমবি এবং অন্যান্য চরমপন্থী দলগুলোর বর্তমান অপতৎপরতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য এক বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি সাভারের শ্যামপুরে অভিযানে ধরা পড়ে মামুনের প্রধান সহযোগী আরিফ ওরফে ইমরান। তার দেওয়া তথ্যে বিশাল বিস্ফোরক ভাণ্ডার উদ্ধার করা গেলেও মূল হোতা ‘বোমারু মামুন’ এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, রাজনৈতিক উত্তাল পরিবেশ ও অন্তর্বর্তীকালীন বিচারিক প্রক্রিয়ার সুযোগে খালাস বা জামিন পেয়ে এসব প্রশিক্ষিত অপরাধীরা ফের সঙ্ঘবদ্ধ হচ্ছে। তারা তরুণদের বিভ্রান্ত করে ও কোডনেম (যেমন- জুয়েলের ‘ওস্তাদ’) ব্যবহার করে আন্ডারগ্রাউন্ড কার্যক্রম চালাচ্ছে। পুলিশ আপাতত গ্রেপ্তারকৃত জুয়েলের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় কয়টি মামলা রয়েছে তার বিস্তারিত তালিকা তৈরি করছে এবং পলাতক বোমারু মামুনকে ধরতে চিরুনি অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
মিথ্যা আশ্বাস ও লুটপাটের রাজনীতি; তীব্র ভোগান্তিতে ধুঁকছে দেশের সাধারণ মানুষ। প্রশাসনিক অপেশাদারিত্বে বিপর্যস্ত জনজীবন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনরোষ।
দ্রুত উন্নয়নের দিকে ধাবিত দেশটি উল্টো দ্রুত গতিতে ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে । সাফল্যের স্বর্ণযুগ ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের দূরদর্শী পরিকল্পনা । প্রথম পর্ব:
আজ We Don't Care, কাল প্রত্যাবর্তন