মানবতার চাদরে মোড়ানো এক নির্ভীক সৈনিক: আইভি রহমান স্মরণে
রাজনৈতিক মঞ্চের পেছনে বসে নিভৃতে স্লোগান তোলার সেই মানুষটি আজ ইতিহাসের পাতায় এক বেদনার প্রতীক। পরিচ্ছন্ন রাজনীতির বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যিনি মাঠের লড়াইয়ে জীবন বাজি রেখেছিলেন, সেই আইভি রহমানের প্রস্থানের দীর্ঘ সময় পরেও তাঁর শূন্যতা আজও বাংলার বিবেকবান মানুষকে কাঁদায়। ২০০৪ সালের একুশে আগস্টের সেই বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলায় ঘাতকের নিষ্ঠুর আঘাত যখন তাঁর প্রাণোচ্ছল শরীরটাকে লুটিয়ে দিয়েছিল, তখন কেবল একজন রাজনৈতিক কর্মীই ঝরে যায়নি; বরং স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল নারী অধিকার ও মুক্তির এক অদম্য মশাল।
সারা জীবন যিনি ক্ষমতার মোহ থেকে দূরে থেকে রাজপথের দাবিকে নিজের দাবি বলে মেনে নিয়েছিলেন, সেই আপসহীন নেত্রীর জীবন ছিল ত্যাগের মূর্ত প্রতীক। শৈশব থেকে রাজনীতিতে পথচলা এই মানুষটি ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন একাধারে মমতাময়ী মা ও দায়িত্বশীল গৃহিণী। সংসার এবং রাজনীতির চরম বাস্তবতাকে তিনি যেভাবে পরম মমতায় ব্যালেন্স করেছিলেন, তা আজও বিস্ময় জাগায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের ওপর চলা অন্যায়ের প্রতিবাদে সেদিন তাঁর কণ্ঠে যে ধিক্কার ধ্বনিত হয়েছিল, তা প্রমাণ করে সত্যের প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন।
নারী আন্দোলনের প্রতিটি বাঁকে, পাক্ষিক 'অনন্যা'র গোলটেবিল বৈঠকে কিংবা মানবাধিকারের লড়াইয়ে তাঁর দৃপ্ত উপস্থিতি আজও আমাদের নাড়া দেয়। দলের দুঃসময়ে কিংবা সুসময়ে রাজপথ ছেড়ে যিনি কখনো পিছু হটেনি, তাঁর সেই নিবেদিত প্রাণ আজ শুধুই এক দীর্ঘশ্বাস। অগণিত মানুষের অধিকার অর্জনের লড়াইয়ে তিনি ছিলেন এক নিঃশব্দ সেনাপতি, যিনি প্রচারের আলো এড়িয়ে মানবকল্যাণকেই সর্বোচ্চ ব্রত বলে মনে করতেন।
মৃত্যুর সঙ্গে কয়েক দিনের রক্তক্ষয়ী লড়াই শেষে যখন তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন, তখন তাঁর রক্তমাখা শাড়ি আর দলা পাকানো মাংসপিণ্ড কেবল তাঁর শরীরকেই ক্ষতবংশী করেনি, বরং স্তব্ধ করে দিয়েছিল এদেশের হাজারো মানুষের হৃদয়। রক্তস্নাত সেই চত্বরে ছড়িয়ে থাকা তাঁর জুতো আর ছিন্নভিন্ন পোশাক আজও যেন বিচার চায় ঘাতকদের সেই নৃশংসতার। স্বামী জিল্লুর রহমানের সেই অসহায় আর্তনাদ—"একা আমি বাঁচব কীভাবে!"—আজও আমাদের বুক চিরে যায়। আইভি রহমানের এই মর্মান্তিক বিদায় কেবল একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, এটি গোটা জাতির অপূরণীয় এক বেদনাবিধুর অধ্যায়। বাংলার মাটি ও মানুষের হৃদয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন চিরকাল, তাঁর মহান ত্যাগের বার্তা আমাদের পথ দেখাবে আগামী প্রজন্মের সূর্যসম্ভাবনার দিকে।
লেখক: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন। ছবি : অলোক মিত্র।
সম্পর্কিত সংবাদ
অবরুদ্ধ এক জাতি: ভেঙে পড়া টিকাদান সাফল্য থেকে দায়মুক্তির ছায়ায়। রোগতাত্ত্বিক মহামারী—বাংলাদেশে ২০২৬ সালের হাম ও ডেঙ্গু সংকট । পর্ব-১
সোনারবাংলার দিগন্তে কৃষিবিপ্লব: বাংলাদেশর পাঁচ বারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কালজয়ী যাত্রা। যান্ত্রিকীকরণ ও প্রযুক্তির সোনালী স্পর্শ
একটি ডিনস অ্যাওয়ার্ড প্রত্যাখ্যান: কাঠগড়ায় বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশাসন ও সরকার