‘মক্কা চুক্তি’ ও বাংলাদেশের সম্ভাব্য ঝুঁকি: এক কৌশলগত দ্বিমুখী সংকট
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা তথাকথিত ‘ইসলামিক ন্যাটো’-তে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান ভূ-রাজনীতিতে এক বড় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, রেমিট্যান্স এবং সামরিক আধুনিকায়নের টানে ঢাকা এই জোটে ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও, এর নেপথ্যে বেশ কিছু গুরুতর ভূ-রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি বিদ্যমান।
বাংলাদেশে যেসব বড় ঝুঁকির সম্ভাবনা রয়েছে:
১. ভারতের সাথে সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি ও সীমান্ত ঝুঁকি
• নয়াদিল্লির নিরাপত্তা শঙ্কা: পাকিস্তানের মতো চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী এবং তুরস্কের মতো সমালোচক দেশের সামরিক জোটে বাংলাদেশ যুক্ত হলে নয়াদিল্লি একে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য কৌশলগত হুমকি হিসেবে দেখবে।
• দ্বিপাক্ষিক প্রভাবে টানাপোড়েন: প্রতিবেশী ভারতের সাথে শত্রুভাবাপন্ন সম্পর্ক তৈরি হলে বাণিজ্য, দ্বিপাক্ষিক ট্রানজিট, জ্বালানি আমদানি এবং সীমান্ত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মারাত্মক অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকটে পড়তে পারে।
২. বিদেশি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ফাঁদ • যৌথ প্রতিরক্ষার বাধ্যবাধকতা: চুক্তির প্রধান শর্ত হলো—এক সদস্যের ওপর আক্রমণ হলে তা সবার ওপর আক্রমণ বলে গণ্য হবে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব বা দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশ অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেই সামরিক সংঘাতের অংশ হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
• ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি ক্ষুণ্ণ হওয়া: বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে "সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়" নীতি অনুসরণ করে এসেছে। নির্দিষ্ট কোনো সামরিক ব্লকে যোগ দিলে চীনের সাথে কৌশলগত ভারসাম্য এবং পশ্চিমা বিশ্বের (আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন) সাথে কূটনৈতিক নমনীয়তা নষ্ট হতে পারে।
৩. অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মেরুকরণ
• রাজনৈতিক বিরোধিতা: এই চুক্তিতে যোগ দিলে তারেক রহমানের সরকারকে দেশের অভ্যন্তরীণ ধর্মনিরপেক্ষ, ভারতপন্থী ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলির তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়তে হবে।
• সামাজিক বিভাজন: একটি ধর্মাশ্রিত সামরিক জোটে যোগদানকে কেন্দ্র করে দেশে আদর্শিক মেরুকরণ ও সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পেতে পারে।
পরামর্শ বাংলাদেশ যদি ‘মক্কা চুক্তি’ থেকে কেবল অর্থনৈতিক ও সামরিক সুযোগ-সুবিধা নিতে চায়, তবে পূর্ণাঙ্গ সামরিক অংশীদার না হয়ে কেবল কৌশলগত বা অর্থনৈতিক পর্যবেক্ষক হিসেবে যুক্ত থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। অন্যথায়, বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তির খেলায় পড়ে দেশের সার্বিক স্থিতিশীলতা চরম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
মিথ্যা আশ্বাস ও লুটপাটের রাজনীতি; তীব্র ভোগান্তিতে ধুঁকছে দেশের সাধারণ মানুষ। প্রশাসনিক অপেশাদারিত্বে বিপর্যস্ত জনজীবন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনরোষ।
দ্রুত উন্নয়নের দিকে ধাবিত দেশটি উল্টো দ্রুত গতিতে ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে । সাফল্যের স্বর্ণযুগ ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের দূরদর্শী পরিকল্পনা । প্রথম পর্ব:
আজ We Don't Care, কাল প্রত্যাবর্তন