বুকের ভেতর আটকানো স্বদেশ: খাঁচায় বন্দি স্বপ্নের রক্তক্ষরণ
নিঃশ্বাস নেওয়ার অধিকারটুকুও যেন আজ এক ঝুলন্ত ফাঁসির দড়ি। চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে আসছে এক অজানা আতঙ্কে, আর রাত পোহালেই কান পাতলে শোনা যায় কোনো মায়ের কান্নার শব্দ, কোনো স্ত্রীর বুকফাটা আর্তনাদ। প্রতি মিনিটে যখন একটি জীবন থমকে যায়, একটি তাজা স্বপ্ন বন্দি হয় চার দেয়ালের খাঁচায়, তখন প্রশ্ন জাগে—এ দেশটা আসলে কার? কার বিরুদ্ধে পরিচালিত হচ্ছে এই নিষ্ঠুর, নির্বিচার যুদ্ধ?
প্রতি মিনিটে একজনের বেশি মানুষকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। শুনলে বিশ্বাস হতে চায় না, কিন্তু এটাই আজ এই পলিমাটির দেশের সবচেয়ে নগ্ন ও নির্মম বাস্তবতা। মে মাসের প্রথম দিন থেকে আগস্টের ২৬ তারিখ—মাত্র ১১৮টি দিন। এই সামান্য সময়ের ব্যবধানে প্রায় দুই লাখ মানুষের ঠিকানা হয়েছে অন্ধকার কারাগার। পরিসংখ্যান বলছে, গড়ে প্রতিদিন ১,৬৫০ জন মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একটি পুরো চার মাসে একটি মাঝারি সাইজের শহরের সমস্ত নাগরিককে যেন পুরে ফেলা হয়েছে জেলের ভেতর!
ক্ষমতার মসনদে বসেছে বিএনপি, আর জামায়াত আজ সংসদের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। কিন্তু ক্ষমতার প্রাথমিক মোহ কাটতে না কাটতেই যদি নেমে আসে এমন নির্মম দমন-পীড়ন, তবে সাধারণ মানুষের ভবিষ্যতের নিরাপত্তা কোথায়? ইতিমধ্যে ২৩ হাজারের বেশি মামলায় আসামি করা হয়েছে ৩৪ হাজারের বেশি মানুষকে। এগুলো তো কেবল খাতা-কলমের হিসেব। বাকি দেড় লাখেরও বেশি নিরপরাধ মানুষকে কোন অপরাধে, কার নির্দেশে, কীসের স্বার্থে তুলে নেওয়া হলো? রাষ্ট্রীয়ভাবে এই নিখোঁজ ও গ্রেপ্তারের কোনো জবাবদিহিতা নেই, নেই কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা।
এই দৃশ্যপট আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের সেই অন্ধকার অধ্যায়ে। বিরোধী রাজনৈতিক মত দমনের নামে গায়েবি মামলা, গভীর রাতে দরজায় বুটের লাথি, আর থানায় থানায় আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করার যে দুঃস্বপ্ন বাংলাদেশ দেখেছিল—ইতিহাস যেন ঠিক একই রক্তভেজা পথে আবার ফিরে এসেছে। নতুন মোড়কে সাজানো হচ্ছে সেই পুরনো আতঙ্কের মঞ্চ। রাজনৈতিক প্রতিশোধের এই দাবানলে পিষে মরছে সাধারণ মানুষ, যাদের একমাত্র অপরাধ ছিল একটু নিরাপদে বেঁচে থাকার আকুতি।
যে মা আজ দরজার খিল ধরে পথ চেয়ে বসে আছেন, যে সন্তান রাতে ঘুমাতে পারছে না বাবার ফেরার অপেক্ষায়—তাদের এই চোখের জলের দাম কে দেবে? ক্ষমতা আজ রাজনীতির হাতবদল হতে পারে, ক্ষমতার অহঙ্কারে রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হতে পারে, কিন্তু একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশে নিজের ঘরে ঘুমানোর অধিকারটুকু কেড়ে নেওয়ার নাম কী গণতন্ত্র? নাকি দেশটা আজ পরিণত হয়েছে এক বিশাল উন্মুক্ত কারাগারে, যেখানে প্রতিটি নাগরিক কেবল নিজের গ্রেপ্তারের প্রহর গুনছে?
রাজনীতি যখন প্রতিশোধের উন্মাদনায় অন্ধ হয়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষের কান্না সেই অন্ধ শাসক পর্যন্ত পৌঁছায় না। তবে ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। ক্ষমতার দাপটে আজ যাদের জীবনের ছন্দ হারিয়ে যাচ্ছে অন্ধকার সেলে, তাদের এই বোবা কান্না একদিন ইতিহাসের পাতায় সব হিসাব কড়ায়-গণ্ডায় বুঝিয়ে নেবে।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
ঝটিকা মিছিলের আতঙ্ক ও বিস্ফোরক অডিও ফাঁস: এসবি প্রধানসহ পুলিশে বড় রদবদল। শীর্ষ পর্যায়ে ১১ পদে পরিবর্তন: প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও পুলিশের মাঠপর্যায়ে বাড়ছে অসন্তোষ
রক্তাক্ত বাংলাদেশ ও সুশীল মুখোশের আড়ালে নজিরবিহীন রাষ্ট্রীয় ডাকাতি: ইউনূস সরকারের দেড় বছরের ভয়াবহ প্রতারণার চালচিত্র: আবেগের ছলে ক্ষমতার মোহ: এক মেটিকুলাস চক্রান্তের শিকার জাতি।
কূটনৈতিক সমীকরণে নতুন মোড়: পুতিন-হাসিনা ' ফোনালাপ' ও রূপপুর প্রকল্প ও দক্ষিণ এশিয়ায় ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ, ব্রিকস সম্মেলনের নেপথ্য আলোচনা ও বিশ্ব নেতাদের ভূমিকা