শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

দীপ্তিময় এক ধ্রুবতারা: শহীদ শেখ কামাল ও ইতিহাস পুনরুদ্ধারের দায়

লিখেছেন: অনোয়ারুজ্জামন চৌধুরী প্রকাশিত: ৫ আগস্ট ২০২৬, ৭:৪৩ এএম
দীপ্তিময় এক ধ্রুবতারা: শহীদ শেখ কামাল ও ইতিহাস পুনরুদ্ধারের দায়

শ্রাবণ মাসের সেই কালো রাতে যখন ঘাতকের নির্মম বুলেটে থেমে গিয়েছিল একটি অদম্য প্রাণ, তখন কেবল এক তরুণের জীবনপ্রদীপ নেভেনি; বরং থমকে গিয়েছিল একটি সদ্য স্বাধীন দেশের বহুমাত্রিক স্বপ্নের অভিযাত্রা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র, বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন শেখ কামাল ছিলেন তেমনই এক নক্ষত্র, যাঁর আলো মুছে ফেলার জন্য ইতিহাস বিকৃতির জঘন্যতম খেলা খেলেছিল ঘাতকচক্র ও তাদের সুবিধাভোগীরা। শৈশবে যাঁর নামে শুনেছি কত না কুৎসিত মিথ্যাচার, সময়ের পরিক্রমায় স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গনে তাঁর শিক্ষক, সহকর্মী আর ইতিহাসের সত্যভাষীদের মুখ থেকে তাঁকে চেনার পর হৃদয়ে জেগে ওঠে গভীর বিস্ময় ও শ্রদ্ধা। উপলব্ধি করা যায়—তিনি ছিলেন এক ট্র্যাজিক নায়ক, যার রক্তে মিশে ছিল অপার দেশপ্রেম, সততা ও অমিত নেতৃত্বগুণ।

শেখ কামাল ছিলেন একাধারে অসামান্য ক্রীড়াবিদ, অনন্য ক্রীড়া সংগঠক, অনুকরণীয় নাট্যকর্মী ও তুখোড় ছাত্রনেতা। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে যখন পৃথিবীর তরুণ সমাজ পথ হারানোর ঝুঁকিতে ছিল, তখন তিনি বাংলাদেশের যুবসমাজকে যুক্ত করেছিলেন খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতি ও সৃজনশীল রাজনীতির ইতিবাচক স্রোতে। রাষ্ট্র ও সরকারের শীর্ষতম পরাক্রমশালী পরিবারের সন্তান হয়েও ক্ষমতার মোহ তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। সেনাবাহিনীর লোভনীয় পদ ছেড়ে সাধারণ কর্মী হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন দেশ গড়ার কাজে। ক্ষমতার আলো থেকে দূরে থেকে মেধা, স্পষ্টবাদিতা আর ত্যাগ দিয়ে তরুণদের মন জয় করাই ছিল তাঁর মূল দর্শন। সমকালীন বিশ্ব রাজনীতিতে কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের সন্তানে এমন বিরল ও নির্মোহ ব্যক্তিত্বের সন্ধান পাওয়া দুষ্কর।

পঁচাত্তরের রক্তাক্ত পটপরিবর্তনের পর খুনিচক্র খুব ভালো করেই জানত—শেখ কামালের মতো বহুমাত্রিক ও চৌকস তরুণ নেতার আদর্শ যদি তরুণ প্রজন্ম জানতে পারে, তবে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে কখনোই মুছে ফেলা যাবে না। তাই তারা সুপরিকল্পিতভাবে ছড়াতে থাকে জঘন্য অপপ্রচার ও মনগড়া ইতিহাস। ব্যাংক ডাকাতির মতো জঘন্য মিথ্যা গল্প সাজিয়ে বীর পিতাসহ এই বীর সন্তানকে কলঙ্কিত করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। কিন্তু সত্যের আলো কখনো দীর্ঘকাল চাপা থাকে না। ইতিহাস সাক্ষী, বঙ্গবন্ধু পরিবারের কোনো বেআইনি ধন-সম্পদের অস্তিত্ব কোথাও ছিল না; খুনিদের প্রতিটি কল্পিত অভিযোগই কালের নিয়মে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।

আজ বড় অনুতাপ হয়, শেখ কামাল যদি বেঁচে থাকতেন! তাহলে হয়তো এ দেশের রাজনীতি আরও অনেক আগেই মেধাভিত্তিক ও সৃজনশীল রূপ পেত। তাঁর মতো দূরদর্শী মানুষ পাশে থাকলে রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর অগ্রজ, দেশরত্ন শেখ হাসিনার পথচলা হতো আরও সুগম; আর সংস্কৃতি ও ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে বহুদূর এগিয়ে যেত। তবে তাঁর সেই আদর্শের ধারা আজও থেমে নেই। বিশ্বের ক্ষমতাধর রাজনৈতিক পরিবারগুলো যখন সময়ের সাথে ম্লান হয়ে যায়, সেখানে বঙ্গবন্ধুর পরিবার মেধা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বিশ্বমঞ্চে অনন্য অবদানের মাধ্যমে আজ আরও বেশি উদ্ভাসিত ও নন্দিত।

ইতিহাসে মানুষের জাগতিক অবসান ঘটলেও তার আদর্শিক সত্তা চির অমলিন থাকে। ঘাতকেরা শেখ কামালের শরীরকে স্তব্ধ করলেও তাঁর জাগ্রত সত্তাকে বাঙালি হৃদয় থেকে মুছে ফেলতে পারেনি। কিন্তু কেবল স্মৃতিরোমন্থন নয়, আজ সময় এসেছে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে শেখ কামালের বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব, সমাজভাবনা ও রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ব্যাপক গবেষণার।

আজ এই মহান ও কিংবদন্তিতুল্য তরুণ নেতার শুভ জন্মদিনে আমাদের বুকভরা ভালোবাসা ও সশ্রদ্ধ প্রণতি। আপনি আমাদের স্বপ্ন ও প্রেরণার চিরন্তন নায়ক। বাঙালির হৃদয়ে, ইতিহাসের প্রতি পাতায় আপনি অমর হয়ে থাকবেন বহ্নিশিখার মতো।

লেখক: অনোয়ারুজ্জামন চৌধুরী,রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন