ভূ-রাজনীতি ও মুক্ত বাণিজ্য: মোদী-পেজেশকিয়ান বৈঠকের বার্তা এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাব
পশ্চিম এশিয়ার ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা এবং সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বিশ্ব রাজনীতির মোড় ঘোরাতে চলেছে ভারত ও ইরানের শীর্ষ নেতাদের সাম্প্রতিক আলোচনা। কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে আয়োজিত 'সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন' (এসসিও) সম্মেলনের পার্শ্ববৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক গুরুত্ব বহন করছে। ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর সৃষ্ট তীব্র সংকট এবং হরমুজ প্রণালীর অবরুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে দুই দেশের প্রধানের এটিই প্রথম মুখোমুখি সাক্ষাৎ।
সামরিক সংঘাত ও ভারতের উদ্বেগ
চলতি পরিস্থিতির ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে হরমুজ প্রণালীর লারাক দ্বীপে মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ এবং তার জবাবে জর্ডনের একাধিক মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের 'আগ্রাসনের শাস্তি' অভিযানের মধ্য দিয়ে। আঞ্চলিক এই যুদ্ধপরিস্থিতির চরম প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যে। মোদী-পেজেশকিয়ান আলোচনায় দিল্লির অবস্থান ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট—ভারত শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের পক্ষে।
ভারতের মূল উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু দুটি:
• জ্বালানি নিরাপত্তা ও মুক্ত বাণিজ্য: আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেল বহনের অন্যতম প্রধান পথ হলো হরমুজ প্রণালী। এই অঞ্চলে বাণিজ্য জাহাজের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু-হু করে বাড়বে, যা ভারতের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য মারাত্মক চাপের সৃষ্টি করবে।
• নাবিক ও পণ্যের সুরক্ষা: হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ থাকায় বাণিজ্যিক জাহাজের ক্রু ও ভারতীয় নাবিকদের জীবন ঝুঁকিতে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী মোদী বৈঠকে এই জলপথে অসামরিক পণ্যবাহী জাহাজের অবাধ ও নিরাপদ চলাচলের ওপর বিশেষভাবে জোর দিয়েছেন।
কূটনৈতিক কৌশলের ভারসাম্য
ভারত ভূ-রাজনৈতিকভাবে এক জটিল ভারসাম্যের কূটনীতি পরিচালনা করছে। একদিকে আমেরিকার সঙ্গে কৌশলগত ও বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব বজায় রাখা, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে কৌশলগত যোগাযোগ ও শক্তি নিরাপত্তার সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা—দিল্লির জন্য এটি এক কঠিন পরীক্ষা। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে মোদীর নির্ধারিত বৈঠক এই বহুমুখী কূটনীতির অংশ। অন্যদিকে, এসসিও-র এই আন্তর্জাতিক মঞ্চকে ব্যবহার করে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সহানুভূতি ও কূটনৈতিক সমর্থন আদায় করা তেহরানের প্রধান লক্ষ্য।
বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান যুদ্ধাবস্থা কেবল ওই অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। ভারতের বাণিজ্য স্বার্থ রক্ষা করতে হলে হরমুজ প্রণালীতে অবিলম্বে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
বৈঠকে ভারতের শান্তি প্রস্তাব ও নিরপেক্ষ ভূমিকা আন্তর্জাতিক জলপথ সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত যদি আরও দীর্ঘায়িত হয়, তবে কূটনৈতিক মধ্যস্থতা করা দিল্লির জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠবে। বিশ্বশান্তি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে এই অঞ্চলে সামরিক শক্তি প্রয়োগের বদলে দ্রুত বাণিজ্যিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আলোচনার টেবিলে ফিরে আসাই একমাত্র টেকসই সমাধান।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
মিথ্যা আশ্বাস ও লুটপাটের রাজনীতি; তীব্র ভোগান্তিতে ধুঁকছে দেশের সাধারণ মানুষ। প্রশাসনিক অপেশাদারিত্বে বিপর্যস্ত জনজীবন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনরোষ।
দ্রুত উন্নয়নের দিকে ধাবিত দেশটি উল্টো দ্রুত গতিতে ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে । সাফল্যের স্বর্ণযুগ ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের দূরদর্শী পরিকল্পনা । প্রথম পর্ব:
আজ We Don't Care, কাল প্রত্যাবর্তন