শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল রেণু: একটি জাতির নেপথ্য শক্তি

লিখেছেন: ড.আবুল হাসনাৎ মিল্টন প্রকাশিত: ৮ আগস্ট ২০২৬, ৭:৫৫ এএম
ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল রেণু: একটি জাতির নেপথ্য শক্তি

মহাকালের পাতায় কিছু মানুষ আসেন আলোকবর্তিকা হয়ে, আর কিছু মানুষ থাকেন সেই আলোকবর্তিকার সলতে হয়ে—যারা নিরবে-নিভৃতে নিজেদের পুড়িয়ে অন্যকে আলোকিত করেন, সমাজ ও জাতিকে পথ দেখান। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন স্বাধীন বাংলার আলোকবর্তিকা, আর সেই আলোর পেছনে যে নিঃস্বার্থ, ধীরস্থির এবং শক্ত ভিত্তিটি আজীবন আগলে রেখেছিলেন, তিনি আর কেউ নন—আমাদের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, যাকে বঙ্গবন্ধু ভালোবেসে ডাকতেন ‘রেণু’।

বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’ এবং তার বিভিন্ন চিঠিপত্রের প্রতিটা পাতায় চোখ বোলালে রেণুর যে রূপটি ভেসে ওঠে, তা কেবল একজন সহধর্মিণীর নয়; তা হলো একজন ধৈর্যশীল প্রেরণা, একজন দূরদর্শী সহযোদ্ধা এবং মহিয়সী নারীর এক অনবদ্য প্রতিকৃতি।

ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল রেণু ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’-তে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, কীভাবে শৈশব থেকে কৈশোর পার হয়ে রাজনৈতিক জীবনের ঝোড়ো হাওয়ায় রেণু তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। সংসারের কোনো চাহিদা রেণুর ছিল না। অল্প বয়সেই মা-বাবাকে হারিয়ে নিজের দুঃখ গোপন করে পরম মমতায় আগলে রেখেছিলেন গৃহকোণ। বঙ্গবন্ধু যখন দেশের কাজে, মিছিলে কিংবা আন্দোলনে ঘুরে বেড়াতেন, রেণু তখন নীরবে সংসার সামলাতেন, পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দিতেন। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন:

“রেণু আমাকে অল্প টাকা-পয়সা দিত, যখন প্রয়োজন হতো। রেণু না থাকলে আমি রাজনীতি করতে পারতাম কি না সন্দেহ।”

একজন রাজনীতিবিদের পেছনে একজন নারীর এই যে নীরব বিনিয়োগ, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। সংসারের অভাব-অনটন, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া—সবকিছু একা হাতে সামলেছেন, অথচ স্বামীর কাছে কখনো কোনো অভিযোগ করেননি।

জেলগেটের সেই নীরব সঙ্গিনী ‘কারাগারের রোজনামচা’ জুড়ে ছড়িয়ে আছে রেণুর প্রতি বঙ্গবন্ধুর এক গভীর হাহাকার ও শ্রদ্ধাবোধ। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসে বঙ্গবন্ধু যখন দিন গুনতেন, তখন ১৫ দিন বা এক মাস পর জেলগেটে রেণুর আগমন ছিল বঙ্গবন্ধুর কাছে এক চিলতে রোদ। রেণু শুধু একা আসতেন না, সাথে আনতেন সন্তানদের, আর নিয়ে আসতেন দেশের মানুষের হালচাল ও রাজনৈতিক নানা বার্তা।

বঙ্গবন্ধু লিখেছেন কীভাবে জেলগেটে এসে রেণু স্বামীকে বলতেন, “সংসার নিয়ে চিন্তা করো না, তুমি দেশের কাজ করো। তোমার শরীর ভালো রাখো।” নিজের ভেতরের কষ্ট, অনিশ্চয়তা আর সন্তানদের ভবিষ্যতের ভয়কে হাসিমুখে চেপে রেখে বঙ্গবন্ধুর মনোবল ধরে রেখেছিলেন তিনি। জেলখানায় বঙ্গবন্ধুর বই পড়ার শখ বা লেখার প্রেরণা—সবকিছুর পেছনেই ছিলেন রেণু। খাতা কিনে জেলগেটে পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে সেই পরম স্মৃতিগুলো সংরক্ষণ করার কাজ রেণু না করলে আজ আমরা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বা ‘কারাগারের রোজনামচা’র মতো মহাকাব্য পেতাম না।

চিঠির পাতায় ভালোবাসা ও নির্ভরতা বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন চিঠিতে ফুটে ওঠে রেণুর প্রতি তার গভীর আস্থা আর ভালোবাসা। বছরের পর বছর কারাগারে থাকা স্বামীর কাছে রেণু ছিলেন এক বিশ্বস্ত নীড়। চিঠির অক্ষরে অক্ষরে ছড়িয়ে থাকত রেণুর প্রতি বঙ্গবন্ধুর অপার ব্যাকুলতা। রাজনৈতিক উত্তাল দিনগুলোতে বাইরে রেণু কীভাবে একাই একটি বিশাল রাজনৈতিক পরিবারের অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেছেন, তা ভেবে বঙ্গবন্ধু বারবার বিমোহিত হয়েছেন।

১৯৬৯-এর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় যখন বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসি দেওয়ার চক্রান্ত চলছিল, কিংবা ১৯৭১-এর অগ্নিঝরা দিনগুলোতে যখন পুরো দেশ উত্তাল—তখনো বঙ্গমাতা ছিলেন হিমালয়ের মতো অটল। কোনো প্রলোভন, কোনো ভয় তাকে টলাতে পারেনি। তিনি জানতেন, তার স্বামী কেবল তার একার নন, পুরো বাঙালি জাতির।

একটি জাতির নেপথ্য শক্তি বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব কেবল একজন গৃহিণী ছিলেন না, তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ছায়া, দেশের সংকটে নেপথ্য পরামর্শক। কিন্তু এই বিশাল ত্যাগের বিনিময়ে তিনি কখনো অহংকার করেননি, প্রচারের আলোয় আসতে চাননি। সব সময় সাধারণ আটপৌরে শাড়িতে, শান্ত মুখে দেশের সেবা করে গেছেন।

১৫ই আগস্টের সেই কালরাতে ঘাতকের বু বুলেট যখন এই মহিয়সী নারীর বুক ঝাঁঝরা করে দিল, তখনও তিনি বঙ্গবন্ধুর পাশ ছাড়েননি। আজীবন যিনি স্বামীর ছায়াসঙ্গী ছিলেন, মরণেও তিনি তার সাথী হয়েই রয়ে গেলেন। বঙ্গমাতা রেণু—বাঙালি জাতির ইতিহাসে এমন এক নাম, যা ত্যাগ, ভালোবাসা, ধৈর্য এবং শক্তির এক অমর প্রতীক হয়ে চিরকাল আমাদের হৃদয়ে অমলিন থাকবে।

লেখক: ড.আবুল হাসনাৎ মিল্টন, প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা