বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুননেছা মুজিব: ইতিহাসের নেপথ্যের মহীয়সী নারী
“পৃথিবীতে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।” — কাজী নজরুল ইসলাম
এই অমর পঙ্ক্তি শুধু কবিতার অলংকার নয়; এটি মানবসভ্যতার এক চিরন্তন সত্য। ইতিহাস যখন কোনো মহান নেতার নাম উচ্চারণ করে, তখন তাঁর পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা একজন নারীর অবদানও সমানভাবে উচ্চারিত হওয়া উচিত। কারণ ইতিহাসের অনেক বিজয়, অনেক সংগ্রাম এবং অনেক সাফল্যের পেছনে থাকে এক নিঃশব্দ শক্তি—একজন মা, একজন স্ত্রী, একজন সহযোদ্ধা।
বাংলাদেশের ইতিহাসে সেই নীরব শক্তির নাম বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুননেছা মুজিব।
আজ তাঁর জন্মদিনে আমরা শুধু একজন মহান নেতার সহধর্মিণীকে স্মরণ করছি না; আমরা স্মরণ করছি এমন এক মহীয়সী নারীকে, যিনি নিজের জীবন, স্বপ্ন ও সুখ বিসর্জন দিয়ে একটি জাতির ইতিহাস নির্মাণে অনন্য ভূমিকা রেখেছেন।
তৎকালীন সমাজব্যবস্থার প্রচলিত রীতিনীতি অনুযায়ী অল্প বয়সেই তাঁর সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের বিবাহ হয়। সময়ের পরিক্রমায় সেই কিশোরী রেণুই হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধুর জীবনের সবচেয়ে বড় আস্থার ঠিকানা। তিনি কখনো ক্ষমতার অংশীদার হতে চাননি; তিনি হতে চেয়েছিলেন সংগ্রামী এক মানুষের সাহসের উৎস।
যখন বঙ্গবন্ধু ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, গণঅভ্যুত্থান এবং স্বাধীনতার সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে বারবার কারাবন্দি হয়েছেন, তখন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুননেছা মুজিব নীরবে এক অসাধারণ দায়িত্ব পালন করেছেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় অংশ কারাগারে কাটিয়েছেন। কিন্তু তাঁর দীর্ঘ অনুপস্থিতির সময়ে বঙ্গমাতা শুধু সংসারের হালই ধরেননি; তিনি আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নেতা-কর্মীদের পাশে থেকেছেন, তাঁদের সাহস, প্রেরণা ও মানসিক শক্তি যুগিয়েছেন। রাজনৈতিক সংকটের কঠিন সময়ে তাঁর বাসভবন নেতা-কর্মীদের জন্য মায়ের মমতাময়ী আস্থার এক নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছিল।
বঙ্গমাতা অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতেন। প্রয়োজনে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চিন্তা ও দিকনির্দেশনার আলোকে নেতা-কর্মীদের উৎসাহিত করতেন এবং আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। তিনি বুঝতেন, একজন মানুষের মুক্তি নয়, একটি জাতির মুক্তির সংগ্রাম চলছে। তাই ব্যক্তিগত কষ্টকে কখনো জাতীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেননি।
একই সঙ্গে তিনি বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর মমত্ববোধ, দায়িত্বশীলতা ও স্নেহের পরিচয় দিয়েছেন। সন্তানদের শুধু একজন পিতার অনুপস্থিতির কষ্ট থেকে আগলে রাখেননি, তাঁদের মধ্যে দেশপ্রেম, আদর্শ, শৃঙ্খলা ও আত্মত্যাগের শিক্ষা গড়ে তুলেছিলেন. তাঁহার উজ্জ্বল উদাহরণ জন নেত্রী শেখ হাসিনা ষিনি পিতার মত অকুতোভয় সংগ্রামী সাহস এবং মায়ের মত মাতৃত্ব ও আত্মা ত্যগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত .সীমাহীন অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট, নজরদারি এবং রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও তিনি সংসারকে দৃঢ়তার সঙ্গে পরিচালনা করেছেন, যাতে বঙ্গবন্ধু কারাগারে থেকেও পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন না হন।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের বহু সংকটময় মুহূর্তে বঙ্গমাতার ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও সাহস তাঁকে শক্তি জুগিয়েছে। প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেও তিনি ছিলেন ইতিহাসের অন্যতম নীরব নির্মাতা। স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামকে তিনি নিজের সংগ্রাম হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বন্দি অবস্থায় থেকেও তিনি ভেঙে পড়েননি। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেয়ে তিনি দেশের স্বাধীনতাকে বড় করে দেখেছিলেন। তাঁর ধৈর্য, আত্মত্যাগ ও মানসিক দৃঢ়তা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়।
কিন্তু ইতিহাসের নির্মমতম অধ্যায় আসে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বঙ্গমাতাও ঘাতকদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। তিনি জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন—যিনি সংগ্রামের সঙ্গী, তিনি আত্মত্যাগেরও সঙ্গী।
আজকের বাংলাদেশে নারীর নেতৃত্ব, ক্ষমতায়ন ও আত্মমর্যাদার কথা যখন আমরা বলি, তখন বঙ্গমাতার জীবন আমাদের সামনে এক উজ্জ্বল আদর্শ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি প্রমাণ করেছেন, নেতৃত্ব সব সময় মঞ্চে দাঁড়িয়ে দেওয়া ভাষণে নয়; অনেক সময় নীরব ত্যাগ, ধৈর্য, প্রজ্ঞা এবং আত্মনিবেদনের মধ্য দিয়েও ইতিহাস সৃষ্টি হয়।
আজ তাঁর জন্মদিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক—আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলব, যেখানে প্রতিটি নারী সম্মান, মর্যাদা ও সমান সুযোগ ও অধিকার লাভ করবে; যেখানে দেশপ্রেম, সততা, মানবিকতা এবং মনুষ্যত্ব উৎকর্ষতাই হবে জাতীয় জীবনের মূল ভিত্তি।
বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুননেছা মুজিব শুধু বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী ছিলেন না; তিনি ছিলেন তাঁর সাহস, শক্তি, প্রেরণা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের এক নীরব আলোকবর্তিকা । তাঁর অবদান ইতিহাসের পাতায় যেমন অম্লান, বঙ্গমাতার অবদান কালের বিবর্তনে শত শত বছর পরেও বাঙালির হৃদয়ে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে শ্রদ্ধাভরে স্মরণীয় হয়ে থাকবে, যেমনভাবে উদ্যাপিত হবে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরব । কারণ বাঙালির স্বাধীনতার ইতিহাসে বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ।
লেখক: শচীন বাঙালি,কলামিস্ট ও রাজনৈতি বিশ্লেষক
সম্পর্কিত সংবাদ
দ্রুত উন্নয়নের দিকে ধাবিত দেশটি উল্টো দ্রুত গতিতে ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। কূটনৈতিক সাফল্য ও বর্তমান নীতিহীনতার ফলে সৃষ্টি সংকট। দ্বিতীয় পর্ব:
জিন্নাহর উত্তরাধিকার ও জামায়াতের রাজনীতি: আদর্শিক ধারাবাহিকতা নাকি সুবিধাবাদ?
তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের ধাক্কা: রূপপুর নিয়ে ঢাকার সুর বদল, ভিয়েনায় রোসাটমের সঙ্গে জরুরি বৈঠক