রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

মতামত

শেখ হাসিনার উন্নয়ন ভাবনা-১

লিখেছেন: নীহারিকা রায়, উন্নয়ন কর্মী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট প্রকাশিত: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:৩৪ পিএম
শেখ হাসিনার উন্নয়ন ভাবনা-১

উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশে বর্তমানে বস্তুগত অগ্রগতি ও সামাজিক মূল্যবোধের দ্বন্দ্বে এক জটিল বৈপরীত্য দৃশ্যমান। সমাজের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির অনৈতিক উপায়ে অর্থ উপার্জন, বিদেশে অর্থ পাচারের প্রবণতা এবং এর সপক্ষে মেলা নানা প্রমাণ প্রমাণ করে যে, সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তনে এক ধরণের মিশ্র প্রতিক্রিয়া কাজ করছে।

একদিকে নগরায়ন ও আধুনিক শিক্ষার ফলে মানুষের মাঝে সচেতনতা বাড়ছে; অন্যদিকে যৌথ পরিবারপ্রথা ভেঙে যাওয়া, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার বিকাশ, গ্রামীণ পরিবারের আয় বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল মাধ্যমের অপ্রতিরোধ্য প্রভাবে পারস্পরিক সম্পর্কের আন্তরিকতা ও গভীরতা হ্রাস পাচ্ছে। যুবসমাজের ওপর প্রযুক্তির প্রভাবও দ্বিবিধ—একদিকে যেমন সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে, অন্যদিকে তৈরি হয়েছে জটিল মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক সংকট।

প্রযুক্তির সুবিধা ও সামাজিক সংকটের দ্বন্দ্ব প্রযুক্তির কল্যাণে তরুণদের বৈশ্বিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে, আধুনিক শিক্ষার সুযোগ অবারিত হয়েছে এবং ফ্রিল্যান্সিং ও আইটি খাতের সুবাদে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে তৈরি হচ্ছে ডিজিটাল আসক্তি, শারীরিক সমস্যা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। ফলে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার দ্বন্দ্ব এখন সমাজে এক নতুন রূপ পরিগ্রহ করেছে।

গ্রামীণ অবকাঠামো ও কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ গ্রামীণ আবাসিক অবকাঠামোতে একদিকে যেমন অনুভূমিক সম্প্রসারণ ঘটছে, তেমনি জমি সাশ্রয়ে শহরের মতো উলম্ব বহুতল ভবনও তৈরি হচ্ছে। বিগত এক যুগে গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থায় এসেছে অভূতপূর্ব রূপান্তর। বিদ্যুৎ ও নিরাপদ পানির মতো মৌলিক সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের বৈষম্য এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়।

কৃষি খাতের চিত্রও বদলে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) তথ্য অনুযায়ী, গ্রামের মূল চালিকাশক্তি কৃষি হলেও সেখানে এখন ট্রাক্টর, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ও কম্বাইন হারভেস্টারসহ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ফলে সনাতনী কৃষি ব্যবস্থা এখন আধা-বাণিজ্যিক পর্যায় অতিক্রম করে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ও যান্ত্রিক কৃষির দিকে ধাবিত হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসা, কুটিরশিল্প এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও চাঙ্গা করে তুলেছে। উল্লেখ্য, শহরের চেয়ে গ্রামীণ পরিবারের গড় আয় দ্রুত হারে বাড়ছে—যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনের বড় বার্তা দেয়।

শহরাঞ্চলের রূপান্তর ও অর্থনৈতিক গতিধারা শহর বরাবরই শিল্প ও সেবা খাতের কেন্দ্রবিন্দু। বর্তমানে শহরের অর্থনীতি মূলত ফ্রিল্যান্সিং, টেক-স্টার্টআপ, তথ্যপ্রযুক্তি খাত, ই-কমার্স এবং বহুজাতিক করপোরেট সংস্কৃতির ওপর ভর করে দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। শহরের ভৌত অবকাঠামোতে ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে ও মেট্রোরেলের মতো আধুনিক গণপরিবহন যুক্ত হওয়ায় নাগরিক যাতায়াতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।

শিক্ষা ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা ও কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যবস্থার উন্নতি হলেও উচ্চশিক্ষা ও বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য এখনো শহরের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। তবে আশার কথা হলো, মফস্বল ও জেলা শহরগুলোতেও এখন অত্যাধুনিক মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল এবং ডিজিটাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাপ্তি বাড়ছে।

পরিবার কাঠামো ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন বিভিন্ন সামাজিক জরিপ অনুযায়ী, গ্রামে পূর্বে বিদ্যমান যৌথ পরিবারের আধিপত্য অর্থনৈতিক প্রয়োজন ও মানসিকতার পরিবর্তনের কারণে ভেঙে পড়ছে এবং একক বা অণু-পরিবারের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। একইসাথে শহরের জীবনযাত্রাও মানুষকে ক্রমশ অধিক ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও যান্ত্রিক করে তুলছে। স্মার্টফোন ও সুলভ ইন্টারনেটের প্রভাবে গ্রাম ও শহর উভয় অঞ্চলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্মের বিনোদন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, যা আমাদের হাজার বছরের গ্রামীণ লোকসংস্কৃতি ও সামাজিক মেলবন্ধনকে এক বড় পরিবর্তনের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ ও নগরায়ণের বধ্যভূমি শহরের উপকণ্ঠে অপরিকল্পিত শিল্প-কারখানা স্থাপন এবং আবাদি জমির অবৈধ ব্যবহারের কারণে প্রতি বছর প্রায় ১ শতাংশ হারে কৃষিজমি হ্রাস পাচ্ছে। এ ক্ষয় সত্ত্বেও শহর এলাকার তুলনায় গ্রাম এখনো অনেকটাই নির্মল ও সবুজ। অন্যদিকে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ শহরগুলোকে ক্রমশ "কংক্রিটের জঙ্গলে" পরিণত করছে। অনিয়ন্ত্রিত বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চরম সংকট শহরের দৈনন্দিন জীবনকে বিষিয়ে তুলছে—যা দূরীকরণে প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অভাব ও দুর্নীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

ডিজিটাল সম্ভাবনার ইতিবাচক দিক 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' কর্মসূচির আওতায় গড়ে ওঠা দেশব্যাপী আইসিটি অবকাঠামোর সুবাদে আজ ঘরে বসেই যুবসমাজ ফ্রিল্যান্সিং, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) সংক্রান্ত বিশ্বমানের কাজ শিখছে ও সম্পাদন করছে। ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম ও ইন্টারনেটের কল্যাণে বিশ্বের নামী-দামী শিক্ষা-উপকরণ এখন হাতের নাগালে। ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে তরুণরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখছে। পাশাপাশি ই-কমার্স ও ফেসবুকভিত্তিক ব্যবসা (F-commerce) ব্যবহার করে তরুণ উদ্যোক্তারা নতুন নতুন স্টার্টআপ দাঁড় করাচ্ছেন।

নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক বাস্তবতা মুদ্রার অপর পিঠে রয়েছে গভীর উদ্বেগ। দীর্ঘ সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় কাটানো, অনলাইন জুয়া, চরম একাকিত্ব, বিষণ্ণতা, সাইবার বুলিং এবং আপত্তিকর কনটেন্ট বা পর্নোগ্রাফির প্রতি আসক্তি তরুণদের মানসিক বিকাশ রোধ করছে এবং তাদের নৈতিক মূল্যবোধ অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অতিরিক্ত স্ক্রিন-টাইমের কারণে মনসংযোগের ক্ষমতা ও ধৈর্য আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সমাজের প্রভাবশালী শ্রেণির নৈতিকতাহীন উপায়ে অর্থ উপার্জন, বিদেশে অর্থ পাচার, প্রশাসনিক ক্ষমতা ও অর্থের দাপট দেখানো কিংবা ‘মব’ সংস্কৃতির মাধ্যমে ন্যায়বিচারকে ব্যাহত বা প্রভাবিত করার প্রবণতা—তরুণদের মনস্তত্ত্বে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের এ চরম ধস সমাজকে এক শূন্যতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

এই বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জগুলোকে মূল ভিত্তি হিসেবে ধরে নিয়েই শেখ হাসিনা বাংলাদেশে তাঁর উন্নয়ন ভাবনায় নতুন কৌশল ও আধুনিকতার সংমিশ্রণ ঘটানোর চেষ্টা করছেন। পরবর্তী কিস্তিগুলোতে বিভিন্ন নির্দিষ্ট সেক্টরভিত্তিক উন্নয়ন ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়াস থাকবে।

লেখক: নীহারিকা রায়, উন্নয়ন কর্মী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট