"আমি বাংলাদেশকে মোদির হাতে ছেড়ে দেব"—ট্রাম্পের সেই মন্তব্য, ইন্দো-প্যাসিফিকের সমীকরণ ও বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক ভাগ্য
হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প-মোদি বৈঠকের পর থেকে ওয়াশিংটন ও নতুন দিল্লির মধ্যস্থতায় দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ে এক ধরণের অলিখিত সমঝোতার আভাস পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত এবং প্যাসিফিক ফ্লিট কমান্ডারের মতো উচ্চপর্যায়ের সামরিক কর্মকর্তার ঢাকা সফর প্রমাণ করে যে, ওয়াশিংটন এককভাবে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের নিরাপত্তার সমীকরণ ভারতের ওপর ছেড়ে দিতে প্রস্তুত।
মনে থাকার কথা- "I'll leave Bangladesh to Prime Minister Modi." অর্থাৎ "আমি বাংলাদেশকে মোদীর হাতে ছেড়ে দেব।" ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে নরেন্দ্র মোদিকে পাশে বসিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন।
সেই মন্তব্য তখন অনেকেই হালকাভাবে নিয়েছিলেন। কিন্তু প্রায় দেড় বছর পর, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ঢাকায় দুই দেশের একের পর এক উচ্চপর্যায়ের সফর নজর কাড়ছে-
সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক মানচিত্রে বাংলাদেশকে ঘিরে চরম তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির দৃশ্যপটে বহু মেরুকরণের এই যুগে ঢাকাকে কেন্দ্র করে বড় পরাশক্তিগুলোর অবস্থান ও কৌশলগত পদক্ষেপে একটি নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। বিশ্বরাজনীতির পর্দার আড়ালে চলতে থাকা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এখন ক্রমশ প্রকাশ্যে আসছে, যা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং পররাষ্ট্রনীতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প-মোদি বৈঠকের পর থেকে ওয়াশিংটন ও নতুন দিল্লির মধ্যস্থতায় দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ে এক ধরণের অলিখিত সমঝোতার আভাস পাওয়া যায়। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র কেবল একক প্রভাব বিস্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত এবং প্যাসিফিক ফ্লিট কমান্ডারের মতো উচ্চপর্যায়ের সামরিক কর্মকর্তার ঢাকা সফর প্রমাণ করে যে, ওয়াশিংটন এককভাবে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের নিরাপত্তার সমীকরণ ভারতের ওপর ছেড়ে দিতে প্রস্তুত।
একই সঙ্গে ভারতের গোয়েন্দা প্রধান ও কূটনৈতিকদের ধারাবাহিক উপস্থিতি প্রকাশ করে—ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা, ট্রানজিট সুবিধা এবং ভূরাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে কতটা তৎপর।
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনকে সামলাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে তাদের কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করে। চীনের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' এর আওতায় বাংলাদেশে বিশাল অবকাঠামোগত বিনিয়োগ ওয়াশিংটন ও দিল্লি উভয়ের জন্যই উদ্বেগের কারণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত চায় বাংলাদেশ তাদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বলয়ের কাছাকাছি থাকুক, পাশাপশি বঙ্গোপসাগরে অন্য কোনো তৃতীয় শক্তির আধিপত্য যেন তৈরি না হয়।
মার্কিন- ভারত দৃষ্টিভঙ্গি হলে অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক নিশ্চিত করা এবং বঙ্গোপসাগরে নিজেদের কৌশলগত উপস্থিতি বজায় রাখা।
মহাশক্তিগুলোর এই ভূরাজনৈতিক খেলায় বাংলাদেশের সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে। প্রথমত, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে এই মনোযোগকে কাজে লাগিয়ে বড় ধরনের বৈদেশেক বিনিয়োগ, প্রযুক্তি সহায়তা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব।
বাংলাদেশে চলমান এই কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ কোনো সাময়িক ঘটনা নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদী ভূরাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের সূচনা। বাংলাদেশকে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে "সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়" শেখ হাসিনা সরকারের পররাষ্ট্রনীতি বজায় রেখে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বড় শক্তিগুলোর বলয় তৈরির প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ কি লাভবান হবে, নাকি কৌশলগত ঝুঁকির মুখে পড়বে—তা নির্ভর করবে ঢাকার পরিপক্ব কূটনীতি ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তের ওপর।
লেখক: ড.আবুল হাসনাৎ মিল্টন, সাংবাদিক,রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক,দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা
সম্পর্কিত সংবাদ
দ্রুত উন্নয়নের দিকে ধাবিত দেশটি উল্টো দ্রুত গতিতে ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। কূটনৈতিক সাফল্য ও বর্তমান নীতিহীনতার ফলে সৃষ্টি সংকট। দ্বিতীয় পর্ব:
জিন্নাহর উত্তরাধিকার ও জামায়াতের রাজনীতি: আদর্শিক ধারাবাহিকতা নাকি সুবিধাবাদ?
তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের ধাক্কা: রূপপুর নিয়ে ঢাকার সুর বদল, ভিয়েনায় রোসাটমের সঙ্গে জরুরি বৈঠক