শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও হাদি হত্যাকাণ্ড: তারেক রহমানের দিল্লি সফরের আগে ভারতের পদক্ষেপে ঢাকার নজর

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা প্রকাশিত: ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১:৫৫ পিএম
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও হাদি হত্যাকাণ্ড: তারেক রহমানের দিল্লি সফরের আগে ভারতের পদক্ষেপে ঢাকার নজর

বাংলাদেশ ও ভারতের বিদ্যমান কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন ও সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি ঢাকায় এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা এখন সম্পূর্ণভাবে ভারতের পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে। সফরটি চূড়ান্ত করতে দিল্লির কাছ থেকে দুটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে দৃশ্যমান ও দ্রুত পদক্ষেপ চেয়েছে ঢাকা।

ঢাকা-দিল্লি দরকষাকষি ও সফর পরিস্থিতি

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্যানুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের নির্দিষ্ট তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে উভয় দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে এ বিষয়ে ধারাবাহিক আলোচনা চলছে। ফলে সফরটির সময়সূচি এখন মূলত দরকষাকষির পর্যায়ে রয়েছে। চলতি মাসের ২০ তারিখের পর সফরের সম্ভাবনা নিয়ে যে আলোচনা ছিল, তাতে কিছুটা স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রকাশ্য বক্তব্য সফরের ইতিবাচক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম জানিয়েছেন। তবে ঢাকা আলোচনার দরজা বন্ধ করেনি; বরং সফর সফল করতে কিছু অগ্রগতির অপেক্ষা করছে।

যে দুটি বিষয়ে ভারতের দ্রুত পদক্ষেপ চায় ঢাকা

১. শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ত্বরান্বিত করা: সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করা। ২. হাদি হত্যা মামলার আসামিদের হস্তান্তর: ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলায় জড়িত আসামিরা ভারতে থাকলে তাদের দ্রুত বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা।

প্রত্যর্পণ চুক্তি ও দুই দেশের আইনি অবস্থান ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রত্যর্পণ চুক্তিতে দণ্ডিত বা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের হস্তান্তরের স্পষ্ট বিধান রয়েছে। চুক্তিতে রাজনৈতিক অপরাধের জন্য ছাড় থাকলেও খুন ও হামলার মতো গুরুতর অপরাধকে রাজনৈতিক হিসেবে গণ্য না করার কথা বলা হয়েছে।

এই ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে অবস্থানের কিছুটা ভিন্নতা দেখা দিয়েছে। ঢাকা চায় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক স্তরে দ্রুত পদক্ষেপ। অন্যদিকে, ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিল্লি এই বিষয়টিকে একটি বিশুদ্ধ আইনি প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করছে—যেখানে বাংলাদেশের অভিযোগগুলো ভারতের নিজস্ব আইনে অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় কিনা, তা আইনি কাঠামোর আওতায় যাচাই করা হবে।

দ্বিপক্ষীয় অন্যান্য এজেন্ডা ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব

শেখ হাসিনা ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ হলেও দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কে স্থবিরতা আসেনি। বাণিজ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, ভিসা সহজীকরণ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বিশেষ করে জ্বালানি ও পানিসম্পদ নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

• গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি: ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হতে চলায় এর নবায়নে দ্রুত আলোচনা প্রয়োজন।

• জ্বালানি নিরাপত্তা: দেশের চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় ভারত থেকে অতিরিক্ত ডিজেল আমদানির বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত জানিয়েছে, নিজেদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও শোধনাগারের সক্ষমতা বিবেচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সম্পর্ক বজায় রাখতে ভারতীয় হাইকমিশনারের আশাবাদ

বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর ‘আরও দ্রুত হওয়া উচিত’।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত দুটি সার্বভৌম দেশ এবং কিছু বিষয়ে চ্যালেঞ্জ ও মতপার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক গণতন্ত্রের লক্ষণ। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দুই দেশের লক্ষ্য এক—তা হলো জনগণের উন্নয়ন ও মর্যাদা নিশ্চিত করা। সব জটিলতা কাটিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি ‘সোনালি অধ্যায়’ গড়ে তুলতে আলোচনার বিকল্প নেই।

আগামী দিনে কী ঘটতে পারে? বর্তমান কূটনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, তারেক রহমানের দিল্লি সফর বাতিল হয়নি, বরং তা কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে সম্ভাব্য ঘটনাপ্রবাহ নিচের দিকে মোড় নিতে পারে:

• সফরের নতুন তারিখ ঘোষণা: ভারতের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য বক্তব্য বা রাজনৈতিক তৎপরতার বিষয়ে কোনো প্রশাসনিক বিধিনিষেধ এবং হাদি হত্যা মামলার আসামিদের হস্তান্তরে ইতিবাচক সংকেত মিললে দ্রুতই সফরের নতুন তারিখ নির্ধারিত হতে পারে।

• আইনি জটিলতায় বিলম্ব: প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াকে ভারত যদি সম্পূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি আইনি কাঠামোর ভেতর দিয়ে পরিচালনা করতে চায়, তবে সফর বাস্তবায়নে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হতে পারে।

• প্রযুক্তিগত ও জ্বালানি চুক্তি স্বাক্ষর: বড় ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতা না হলেও, ডিসেম্বর মাসের মধ্যে গঙ্গা চুক্তির নবায়ন এবং অতিরিক্ত ডিজেল সরবরাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দুই দেশের সচিব ও কারিগরি পর্যায়ের বৈঠক দ্রুত অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরিশেষে, উভয় দেশই সম্পর্কের কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করায় আলোচনার পথ উন্মুক্ত রাখছে এবং খুব দ্রুতই কূটনৈতিক মধ্যস্থতায় বরফ গলতে শুরু করতে পারে।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)